২০১৬ সালের আগে বাংলাদেশে এই বিষয়ে দুইটা পুরনো অধ্যাদেশ কার্যকর ছিল — Foreign Donations (Voluntary Activities) Regulation Ordinance, 1978 এবং Foreign Contributions (Regulation) Ordinance, 1982। সময়ের সাথে বদলে যাওয়া চাহিদা ও বাস্তবতার প্রেক্ষিতে এই দুইটা অধ্যাদেশ রহিত করে একটা পরিমার্জিত ও হালনাগাদ আইন প্রণয়ন করা হয় — বৈদেশিক অনুদান (স্বেচ্ছাসেবামূলক কার্যক্রম) রেগুলেশন আইন, ২০১৬ (২০১৬ সনের ৪৩ নং আইন), যা ৬ নভেম্বর ২০১৬ তারিখ থেকে কার্যকর হয়েছে।
এই আইনের মূল উদ্দেশ্য হলো — বাংলাদেশে স্বেচ্ছাসেবামূলক কার্যক্রম পরিচালনাকারী এনজিও ও ব্যক্তিদের বৈদেশিক অনুদান গ্রহণের প্রক্রিয়াকে একটা নিয়ন্ত্রিত, স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক কাঠামোর মধ্যে আনা — যাতে বিদেশি অর্থের অপব্যবহার, অর্থপাচার, বা জাতীয় নিরাপত্তা-বিরোধী কার্যক্রমে এর ব্যবহার প্রতিরোধ করা যায়।
আইনের সংজ্ঞা অনুযায়ী (ধারা ২), এখানে কিছু গুরুত্বপূর্ণ পরিভাষা বোঝা দরকার —
প্র্যাকটিক্যাল তাৎপর্য: যদি আপনার প্রতিষ্ঠান কোনো ধরনের CSR (Corporate Social Responsibility) কার্যক্রমের অংশ হিসেবে বিদেশি কোনো পার্টনার সংস্থা থেকে অনুদান গ্রহণ করে, অথবা আপনি নিজে একটা এনজিও পরিচালনা করেন যেখানে বিদেশি দাতা সংস্থার সহায়তা আসে, তাহলে এই আইনের প্রতিটা বিধান আপনার জন্য সরাসরি প্রযোজ্য।
আইনের ধারা ৩ অনুযায়ী একটা স্পষ্ট নিয়ম বলা আছে —
“কোন সংস্থা বা এনজিও এই আইনের অধীন ব্যুরোর নিকট হইতে নিবন্ধন গ্রহণ ব্যতীত বৈদেশিক অনুদান গ্রহণক্রমে কোন স্বেচ্ছাসেবামূলক কার্যক্রম গ্রহণ ও পরিচালনা করিতে পারিবে না।”
তবে একটা গুরুত্বপূর্ণ ব্যতিক্রমও আছে — যদি কোনো ব্যক্তি একবারমাত্র (one-time) স্বেচ্ছাসেবামূলক কার্যক্রম গ্রহণের উদ্দেশ্যে বৈদেশিক অনুদান গ্রহণ করেন, তাহলে তার নিবন্ধনের প্রয়োজন নেই, তবে ব্যুরোর অনুমোদন অবশ্যই নিতে হবে।
প্র্যাকটিক্যাল উদাহরণ: ধরুন একটা ছোট সংগঠন নিয়মিতভাবে বিদেশি সহায়তা নিয়ে কার্যক্রম চালাতে চায় — তাদের অবশ্যই ব্যুরোতে নিবন্ধন করতে হবে। কিন্তু ধরুন একজন প্রবাসী বাংলাদেশি একটা নির্দিষ্ট এলাকায় একবারের জন্য বন্যার্তদের সাহায্যার্থে কিছু অর্থ পাঠাতে চান — এক্ষেত্রে পূর্ণাঙ্গ নিবন্ধনের প্রয়োজন নেই, তবে সেই নির্দিষ্ট কার্যক্রমের জন্য ব্যুরোর অনুমোদন নিতে হবে।
নিবন্ধনের মেয়াদ ১০ বছর, এবং মেয়াদ উত্তীর্ণ হওয়ার ৬ মাস আগে নবায়নের আবেদন করতে হয়।
এখানে একটা বিষয় অনেকেই ভুল বোঝেন — নিবন্ধন থাকা মানেই যেকোনো পরিমাণ বৈদেশিক অনুদান নির্বিঘ্নে গ্রহণ করা যাবে, এমন নয়। ধারা ৬ অনুযায়ী, প্রকল্প অনুমোদন ব্যতিরেকে কোনো ব্যক্তি বা এনজিও বৈদেশিক অনুদান গ্রহণ করতে পারবে না, এবং সেই ব্যক্তি বা এনজিওর কার্যক্রম অনুমোদিত প্রকল্পের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকতে হবে।
এছাড়াও একটা গুরুত্বপূর্ণ আর্থিক সীমা উল্লেখ আছে — কোনো প্রকল্পে অনুমোদিত ব্যয়ের ২০ শতাংশের অধিক অর্থ প্রশাসনিক খাতে ব্যয় করা যাবে না। অর্থাৎ, একটা বিদেশি অনুদানের কমপক্ষে ৮০ শতাংশ অবশ্যই প্রকৃত কার্যক্রমে ব্যয় হতে হবে, অফিস পরিচালনা বা প্রশাসনিক খরচে নয়।
ধারা ৫-এ একটা সুনির্দিষ্ট নিষেধাজ্ঞার তালিকা দেওয়া আছে। নিম্নলিখিত ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান কোনোভাবেই বৈদেশিক অনুদান গ্রহণ করতে পারবেন না —
প্র্যাকটিক্যাল সতর্কতা: যদি আপনার প্রতিষ্ঠানের বোর্ড সদস্য বা পরিচালকদের মধ্যে কেউ সরকারি চাকরিতে নিযুক্ত থাকেন, অথবা কেউ কোনো রাজনৈতিক পদে থাকেন, তাহলে বৈদেশিক অনুদানের ব্যবস্থাপনা কাঠামো ঠিক করার আগে এই নিষেধাজ্ঞার তালিকাটা ভালোভাবে পর্যালোচনা করে নেওয়া উচিত।
এখানেই আইনের সেই অংশ, যা বাংলাদেশ ব্যাংকের সার্কুলারের সাথে সরাসরি সংযুক্ত। ধারা ৯(১) অনুযায়ী —
“প্রত্যেক ব্যক্তি বা এনজিও বৈদেশিক অনুদান... বাংলাদেশ অথবা দেশীয় মুদ্রায় প্রাপ্ত সকল বৈদেশিক অনুদানের অর্থ কোন তফসিলি ব্যাংকের একটি নির্দিষ্ট ব্যাংক একাউন্টের (মাদার একাউন্ট) মাধ্যমে গ্রহণ করিতে হইবে।”
অর্থাৎ, একটা এনজিও বা ব্যক্তির জন্য বিদেশ থেকে আসা প্রতিটা অনুদান একটামাত্র নির্দিষ্ট “মাদার অ্যাকাউন্ট”-এর মাধ্যমে যেতে হবে — বিভিন্ন অ্যাকাউন্টে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে গ্রহণ করার সুযোগ নেই। এর পাশাপাশি —
এই আইনি কাঠামোকে বাস্তবে কার্যকর করার জন্য বাংলাদেশ ব্যাংকের বৈদেশিক মুদ্রা নীতি বিভাগ থেকে একটা সুনির্দিষ্ট সার্কুলার (সার্কুলার পত্র নং-০৭, তারিখ: ৩০ মে ২০১৭) জারি করা হয়েছে, যা AD (Authorized Dealer) ব্যাংকগুলোর জন্য প্রযোজ্য।
এই সার্কুলারের মূল নির্দেশনাগুলো হলো:
Appendix-FD ফর্মে কী কী তথ্য থাকতে হয়:
প্র্যাকটিক্যাল তাৎপর্য একজন ব্যাংকারের জন্য: যদি আপনি কোনো ব্যাংকের ফরেন এক্সচেঞ্জ বিভাগে কাজ করেন, তাহলে প্রতি ষান্মাসিকে এই রিপোর্ট সময়মতো জমা দেওয়া একটা নিয়মিত কমপ্লায়েন্স দায়িত্ব — এবং যেহেতু এটা Excel ফরম্যাটে ই-মেইলে পাঠাতে হয়, তাই ডেটা সংগ্রহের প্রক্রিয়াটা প্রতিটা শাখা থেকে সময়মতো সংগ্রহ করে কেন্দ্রীয়ভাবে একত্রিত করার একটা অভ্যন্তরীণ সিস্টেম থাকা প্রয়োজন।
ধারা ১৪ ও ১৫ অনুযায়ী, এই আইন বা এর অধীন প্রণীত বিধি লঙ্ঘন করলে মহাপরিচালক (NGO Affairs Bureau) নিম্নলিখিত ব্যবস্থা নিতে পারেন —
উল্লেখযোগ্যভাবে, এই আইনের অধীনে সংঘটিত অপরাধগুলোকে সন্ত্রাস বিরোধী আইন এবং সংবিধান বা বিধিবদ্ধ প্রতিষ্ঠান সম্পর্কে বিদ্বেষমূলক মন্তব্য, রাষ্ট্রবিরোধী কার্যকলাপ, বা মানব পাচারের সাথে সংশ্লিষ্টতার মতো গুরুতর বিষয়ের সাথেও যুক্ত করা হয়েছে — যা এই আইনের প্রয়োগের গুরুত্ব ও কঠোরতা নির্দেশ করে।
যদি আপনার প্রতিষ্ঠান বিদেশি অনুদান গ্রহণ করে বা করার পরিকল্পনা করছে:
1. প্রথমেই যাচাই করুন — আপনার কার্যক্রম কি নিয়মিত ভিত্তিতে, নাকি একবারমাত্র? সেই অনুযায়ী পূর্ণাঙ্গ নিবন্ধন বা একক অনুমোদনের পথে যান।
2. প্রতিটা নির্দিষ্ট প্রকল্পের জন্য আলাদাভাবে ব্যুরোর অনুমোদন নিশ্চিত করুন — একটা সাধারণ নিবন্ধন সব প্রকল্পকে কভার করে না।
3. একটামাত্র নির্দিষ্ট ব্যাংক অ্যাকাউন্ট (মাদার অ্যাকাউন্ট) নির্ধারণ করুন, যার মাধ্যমেই সকল বৈদেশিক অনুদান আসবে।
4. বোর্ড সদস্য বা মূল ব্যক্তিদের মধ্যে কেউ নিষিদ্ধ তালিকার (সরকারি চাকরিজীবী, রাজনৈতিক পদাধিকারী ইত্যাদি) অন্তর্ভুক্ত কিনা, তা আগেভাগেই যাচাই করুন।
5. প্রশাসনিক ব্যয় যেন অনুমোদিত বাজেটের ২০ শতাংশের বেশি না হয়, তার জন্য বাজেট পরিকল্পনার সময়ই এই সীমা মাথায় রাখুন।
6. বার্ষিক প্রতিবেদন ও হিসাব বিবরণী নির্ধারিত সময়ে মহাপরিচালকের কাছে জমা দেওয়ার একটা অভ্যন্তরীণ ক্যালেন্ডার তৈরি করে রাখুন।
যদি আপনি একজন AD ব্যাংক কর্মকর্তা হন:
1. প্রতিটা শাখা থেকে বৈদেশিক অনুদান সংক্রান্ত তথ্য সংগ্রহের জন্য একটা কেন্দ্রীভূত রিপোর্টিং প্রক্রিয়া নিশ্চিত করুন।
2. প্রতি ১৫ জানুয়ারি ও ১৫ জুলাই তারিখের আগে Appendix-FD ফরম্যাটে সমন্বিত বিবরণী প্রস্তুত ও যাচাই করুন।
3. ব্যুরোর অনুমোদনপত্র ছাড়া কোনো বৈদেশিক অনুদানের অর্থ ছাড় না দেওয়ার বিষয়ে শাখা পর্যায়ে সচেতনতা নিশ্চিত করুন।
বৈদেশিক অনুদান গ্রহণ প্রক্রিয়াটা আসলে একটামাত্র আইন বা একটামাত্র প্রতিষ্ঠানের এখতিয়ারে সীমাবদ্ধ নয় — এটা NGO Affairs Bureau-এর নিবন্ধন ও প্রকল্প অনুমোদন প্রক্রিয়া এবং বাংলাদেশ ব্যাংক-এর ব্যাংকিং লেনদেন তদারকি — এই দুইটা স্তরের সমন্বিত একটা কাঠামো। একজন এনজিও পরিচালক, একজন ব্যাংকার, বা একজন কর্পোরেট CSR ম্যানেজার হিসেবে এই দুইটা স্তরের প্রয়োজনীয়তা একসাথে বুঝে রাখলেই আপনি নিশ্চিত হতে পারবেন যে আপনার প্রতিষ্ঠানের বৈদেশিক অনুদান সংক্রান্ত কার্যক্রম সম্পূর্ণভাবে আইনি সীমার মধ্যে রয়েছে।
সূত্র: বৈদেশিক অনুদান (স্বেচ্ছাসেবামূলক কার্যক্রম) রেগুলেশন আইন, ২০১৬ (২০১৬ সনের ৪৩ নং আইন); বাংলাদেশ ব্যাংক, বৈদেশিক মুদ্রা নীতি বিভাগ, সার্কুলার পত্র নং-০৭, তারিখ ৩০ মে ২০১৭।